ট্রাম্পের সামরিক উচ্চাভিলাষের আঁচ প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মার্কিন সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে।

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মার্কিন সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। গত কয়েক দিনে বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে প্রতিরক্ষা খাতের বড় কোম্পানিগুলো। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় আকারে প্রতিরক্ষা বাজেটের ঘোষণা, সামরিক উচ্চাভিলাষ ও বিভিন্ন দেশ আক্রমণের ঘোষণার পর ওয়াল স্ট্রিট ও ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পের শেয়ারদরে জোরালো উত্থান দেখা যাচ্ছে। খবর এপি ও ইউরোনিউজ।

ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারবাজার সূচকগুলো গত বৃহস্পতিবার সামগ্রিকভাবে খুব বেশি ওঠা-নামা করেনি। অল্প কিছু কোম্পানি বিশেষ করে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম নির্মাতাদের শেয়ারদর জোরালোভাবে বেড়েছে।

এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক এদিন খুব সামান্যই বেড়েছে, দশমিক ১ শতাংশেরও কম। টানা চারদিনের মধ্যে এটি ছিল প্রথম পতনের পরের দিন। সূচকটি অবশ্য সপ্তাহের শুরুতে গড়া সর্বকালের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি ছিল। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়লেও নাসডাক কম্পোজিট সূচক কমেছে দশমিক ৪ শতাংশ।

গত সপ্তাহে বেকার ভাতার জন্য আবেদন করা মার্কিন কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে, যা দেশটির শ্রমবাজারে ছাঁটাই বাড়ার একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত। তবে গ্রীষ্মজুড়ে মার্কিন কর্মীদের উৎপাদনশীলতা পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি বেড়েছে। পাশাপাশি অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতিও অপ্রত্যাশিতভাবে কমেছে। এসব খবরও পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলেছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার জানান, ‘ড্রিম মিলিটারি’ গড়তে ২০২৭ সালে মার্কিন সামরিক ব্যয় ৯০ হাজার ১০০ কোটি থেকে বাড়িয়ে দেড় লাখ কোটি ডলারে নিতে চান। ট্রাম্পের গত বুধবারের এমন মন্তব্যের পরদিন এলথ্রি হ্যারিস টেকনোলজিসের শেয়ারদর বাড়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। মার্কিন প্রতিরক্ষা খাতের অন্য দুই শীর্ষ কোম্পানি লকহিড মার্টিন ও নর্থরপ গ্রুম্যানের শেয়ারদর বাড়ে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৩ ও ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এর আগে প্রতিরক্ষা ঠিকাদাররা সামরিক সরঞ্জাম খুব ধীরে তৈরি করছে, ট্রাম্প এমন অভিযোগ করলে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর কমে যায়।

‘উৎপাদন বাড়ানোয় আরটিএক্স সবচেয়ে ধীরগতিতে রয়েছে’ ট্রাম্পের এমন মন্তব্যে প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে কোম্পানিটি। পরবর্তী সময়ে শেয়ারদর মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।

ট্রাম্প গত বুধবার এক নির্বাহী আদেশে সই করেন। সেখানে ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তিতে কিছু শর্ত রাখতে নির্দেশ দেয়া হয় পেন্টাগনকে। যার আওতায় মার্কিন সরকারের সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ কোম্পানিগুলো নিজেদের শেয়ার পুনঃক্রয় করতে পারবে না।

মার্কিন পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক উত্থানে শীর্ষ ভূমিকায় রয়েছে প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলো। কিন্তু বৃহস্পতিবার বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি শেয়ারের দরপতন সামগ্রিক বাজারের উত্থানকে কিছুটা আটকে দেয়। এদিন ২ দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলা এনভিডিয়ার শেয়ারদর।

প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর উত্থানে সামরিক বাজেট ও ভেনিজুয়েলায় আক্রমণের পাশাপাশি আরো কিছু বিষয় প্রভাব ফেলেছে। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে ডেনমার্কের ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড দখল এবং কলম্বিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিতও দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ওয়াল স্ট্রিটে প্রতিরক্ষা খাতের উত্থানের প্রভাব এশিয়ায়ও পড়েছে। গতকাল এখানকার বেশির ভাগ শেয়ারবাজার সূচক বেড়েছে।

টোকিওর নিক্কেই ২২৫ সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ইউনিক্লোর প্যারেন্ট প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিংয়ের শেয়ারদর বেড়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। কোম্পানিটির অক্টোবর-ডিসেম্বরের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়েছে।

হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্টার্টআপ মিনিম্যাক্স হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রথম দিনই কোম্পানিটির শেয়ারদর ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। চীনের মূল ভূখণ্ডের সাংহাই কম্পোজিট সূচক দশমিক ৯ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক প্রায় দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক দশমিক ৮ শতাংশ বাড়লেও তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক ও ভারতের সেনসেক্স কমেছে যথাক্রমে দশমিক ২ ও দশমিক ৭ শতাংশ।

ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারও বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইউরোপের অ্যারোস্পেস ও প্রতিরক্ষা খাতের সূচক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। লন্ডনে তালিকাভুক্ত বিএই সিস্টেমসের শেয়ারদর বেড়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। জার্মানির রেইনমেটাল, ইতালিক লিওনার্দো, সুইডেনের সাব ও যুক্তরাজ্যের কেমরিংয়ের শেয়ারদর বেড়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক ৩৭, ২ দশমিক ৫৫, ২ দশমিক ৩৯ ও দশমিক ৭৯ শতাংশ। এদিন জাপানের মিৎসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের সময়ও এমন চিত্র দেখা গিয়েছিল। তখন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর বেড়েছিল। একই চিত্র দেখা গিয়েছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর। ওই ঘটনার পরের কয়েক দিনে অ্যারোস্পেস ও প্রতিরক্ষা শেয়ার প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছিল। অন্যদিকে এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর কমে গিয়েছিল।

আরও